সিরাজুল আলম খান [৬ জানুয়ারি ১৯৪১ - ৯ জুন ২০২৩] বাংলাদেশে অতি সুপরিচিত নাম। প্রথম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র হিসেবে স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সুখ্যাতি ছিলো। সেই সময়েই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে তিনি ছাত্রলীগ কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীতে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৩-’৬৪ এবং ১৯৬৪-’৬৫ এই দুই বছর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বাঙালির ‘জাতীয় রাষ্ট্র’ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন করেন। নিউক্লিয়াস ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামেও পরিচিত। এই উদ্যোগে তাঁর প্রধান দুই সহকর্মী ছিলেন আবদুর রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদ। ১৯৬২-’৭১ সাল পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন, ৬-দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার আন্দোলন, ১১-দফা আন্দোলনের পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়ন করে এই ‘নিউক্লিয়াস’। এই সব দুর্বার গণ-আন্দোলনের একক কৃতিত্বের দাবিদার যদি কেউ থেকে থাকেন তিনি হলেন সিরাজুল আলম খান। আন্দোলনের এক পর্যায়ে গড়ে তোলা হয় ‘নিউক্লিয়াস’র রাজনৈতিক উইং ‘বিএলএফ’ এবং সামরিক উইং ‘জয় বাংলা বাহিনী’। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে ‘জয় বাংলা’ সহ সকল স্লোগান নির্ধারণ এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে ‘...এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বাক্যসমূহের সংযোজনের কৃতিত্ব ‘নিউক্লিয়াস’র। শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের সিদ্ধান্ত ‘নিউক্লিয়াসে’র। এই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা ছিলো মুখ্য। ১৯৬৯-’৭০ সালে গণ-আন্দোলনের চাপে ভেঙে পড়া পাকিস্তানি শাসনের সমান্তরালে ‘নিউক্লিয়াস’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংগঠিত করা হয় ছাত্র-ব্রিগেড, যুব-ব্রিগেড, শ্রমিক-ব্রিগেড, নারী-ব্রিগেড, কৃষক-ব্রিগেড, সার্জেন্ট জহুর বাহিনী। এদের সদস্যরাই ভেঙে পড়া পাকিস্তানি শাসনের পরিবর্তে যানবাহন চলাচল, ট্রেন-স্টীমার চালু রাখা, শিল্প-কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং থানা পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করে। ‘নিউক্লিয়াস’র সদস্যদের দ্বারা এই সব দুরূহ কাজ সম্পাদনের জন্য কৌশল ও পরিকল্পনাও ‘নিউক্লিয়াস’র। ১৯৭০-’৭১ নাগাদ বিএলএফ-এর সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ হাজারে। এদের প্রত্যেকেই সশস্ত্র যুদ্ধ চলাকালে উন্নত সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত হন এবং ‘মুজিব বাহিনী’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অধীনস্ত ১১টি সেক্টরের পাশাপাশি ৪টি সেক্টরে বিভক্ত করে ‘বিএলএফ’ সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা করে। ‘বিএলএফ’-এর সশস্ত্র সংগ্রামের কৌশল ছিলো কেবল ভিন্ন ধরনেরই নয়, অনেক উন্নতমানের এবং বিজ্ঞানসম্মত। ‘বিএলএফ’-এর চার প্রধান ছিলেন সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১-এর ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান কর্তৃক আকস্মিকভাবে নির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী সভা স্থগিত ঘোষণার পরপরই ২ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকার উত্তোলন, জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণসহ ৩ মার্চের ‘স্বাধীন বাংলার ইশতেহার’ ঘোষণার পরিকল্পনাও ‘নিউক্লিয়াস’র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে এই দুটি কাজ ছিলো প্রথম দিক নির্দেশনা। আর এই দুই গুরুদায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে আ স ম আবদুর রব এবং শাজাহান সিরাজ। ১৯৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের নির্বাচিত করার দায়িত্ব পালন করে ‘বিএলএফ’। নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণ-আন্দোলনে গড়ে ওঠা জনমতকে সাংবিধানিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গণরায়ে পরিণত করার এই কৌশলও নির্ধারণ করে ‘বিএলএফ’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সানন্দে এই সিদ্ধান্ত মেনে নেন। আন্দোলন, নির্বাচন, সমান্তরাল প্রশাসন এবং আসন্ন সশস্ত্র সংগ্রামকে হিসেবে নিয়ে বিভিন্ন বাহিনী গড়ে তোলার কৃতিত্ব সিরাজুল আলম খানের।
১৯৭১-এ স্বাধীনতার পর আন্দোলন-সংগ্রামের রূপ ও চরিত্র বদলে যায়। গড়ে ওঠে একমাত্র বিরোধী দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ‘জাসদ-জেএসডি’। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ‘সিপাহী জনতার গণ-অভ্যুত্থান’ বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। জাসদ গঠন এবং ‘সিপাহী জনতার গণ-অভ্যুত্থান’-এর নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ছিলেন সিরাজুল আলম খান। আর এই দুটি বৃহৎ ঘটনার নায়ক ছিলেন মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব এবং কর্নেল আবু তাহের।
সিরাজুল আলম খান ভিন্ন ভিন্ন তিন মেয়াদে প্রায় ৭ বছর কারাভোগ করেন। সিরাজুল আলম খান-এর বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী অংক শাস্ত্রে হলেও দীর্ঘ জেল জীবনে তিনি দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা, রাজনীতি-বিজ্ঞান, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সমাজ বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান, সামরিক বিজ্ঞান, মহাকাশ বিজ্ঞান, সংগীত, খেলাধুলা সম্পর্কিত বিষয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করেন। ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উপর গড়ে উঠে তাঁর অগাধ পান্ডিত্য এবং দক্ষতা। সেই কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিযুক্ত হন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন রাজ্যের অসকস বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯৬-’৯৭ সালে। আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণে সিরাজুল আলম খান-এর তাত্ত্বিক উদ্ভাবন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়। মার্কসীয় ‘দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’র আলোকে বাংলাদেশের জনগণকে শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী হিসেবে বিভক্ত করে ‘রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক’ মডেল হাজির করেছেন সিরাজুল আলম খান। চিরাচরিত পার্লামেন্টারি ধাঁচের ‘অঞ্চল ভিত্তিক’ প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি শ্রম, কর্ম, পেশায় নিয়োজিত সমাজশক্তিসমূহের ‘বিষয় ভিত্তিক’ প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা সংবলিত ‘দুইকক্ষ’ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠন, ফেডারেল সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন, বাংলাদেশকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন এবং প্রাদেশিক সরকার গঠন, উপজেলা পর্যায়ে স্ব-শাসিত স্থানীয় সরকার পদ্ধতি চালু করার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আইন ব্যবস্থা ও শাসন কাঠামোর পরিবর্তে স্বাধীন দেশের উপযোগী শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মডেল উত্থাপন করেন তিনি। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের স্বীকৃতির প্রয়োজনও তাঁর চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশকে শিল্পায়ন করার লক্ষ্যে প্রবাসীদের অর্থায়নে ‘উপজেলা শিল্প এলাকা’ এবং ‘পৌর শিল্প এলাকা’ গঠন করা তাঁর প্রস্তাব ইতোমধ্যেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘মাইক্রো ক্রেডিট’ (micro-credit) ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং ‘সামাজিক ব্যবসা’ (social business) এর সমর্থক তিনি। ৮২ বছর বয়স্ক সিরাজুল আলম খান দেশ-বিদেশে ‘রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে পরিচিত।
ছাত্র আন্দোলন, গোপন সংগঠনের সংগঠক, গণ-আন্দোলনের কৌশল প্রণয়নকারী, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সশস্ত্র যুদ্ধ পরিকল্পনাকারী সিরাজুল আলম খান বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা। এই সব কারণে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানকে বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার রূপকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
তাঁর দীর্ঘ ৫০/৫৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য ছাত্র-যুব নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক এক বিস্ময়কর ব্যাপার। রাজনৈতিক তত্ত্ব উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল প্রণয়নে তাঁর প্রধান সহযোগীরা হলেন ড. জিল্লুর রহমান খান, প্রফেসর রাজিয়া আহমেদ এবং অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমদ বুলবুল।
ব্যক্তিগত জীবনে সিরাজুল আলম খান অবিবাহিত। অতি সাধারণ জীবন-যাপনে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। ব্যক্তিগত সম্পদ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অর্জনসহ বর্তমান সমাজের অনেক কিছুতেই তিনি বিশ্বাস করেন না।

0 Comments